প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে মুদ্রার গুরুত্ব / প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় মুদ্রার গুরুত্ব

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে মুদ্রার গুরুত্ব / প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় মুদ্রার গুরুত্ব :

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে আমাদের বেশ কতগুলি উপাদানের উপর নির্ভর করতে হয়। যথা, (ক) প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান, (খ) শিল্পকর্ম, (গ) সাহিত্যিক উপাদান। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের মধ্যে বিশেষ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মুদ্রা। মুদ্রা বলতে বোঝায় জিনিসপত্রের ক্রয়বিক্রয় এর মাধ্যম রূপে অনুমোদিত ও ব্যবহৃত প্রতীক ও লেখবিশিষ্ট, নির্দিষ্ট ওজন ও মানের ধাতবখন্ড। আলোচ্য নিবন্ধে আমরা প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে মুদ্রার গুরুত্ব কীভাবে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছে তা আলোচনা করব —

প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস পুনরুদ্ধারের জন্য লেখমালার পাশাপাশি মুদ্রার সাক্ষ্য নিয়মিতভাবে ঐতিহাসিকরা প্রয়োগ করেন। প্রাচীনতম ভারতীয় মুদ্রাগুলি বাদ দিলে পরবর্তী পর্যায়ের অধিকাংশ মুদ্রাই কোনও না কোনও শাসকের নির্দেশে জারি করা হয়েছিল। কালক্রমে মুদ্রা জারি করার একচেটিয়া অধিকার রাজার উপরই বর্তায়।

মৌর্যপরবর্তী আমলে উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিম এলাকায় যে গ্রীক রাজারা ক্ষমতাসীন ছিলেন, তাঁদের কথা জানা যায় মুদ্রা মারফৎ, লেখমালা থেকে নয়। খ্রিস্টীয় প্রথম – দ্বিতীয় শতকে দাক্ষিণাত্যে দীর্ঘকাল ধরে শক–সাতবাহন প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলেছিল, তার একটি পর্বে সাতবাহনরা শকদের পর্যদুস্ত করেছিলেন। গৌতমীপুত্র সাতকর্নির লেখমালায় তার বিবরণ থাকলেও স্পষ্ট সহায়ক সাক্ষ্য পাওয়া যায় মহারাষ্ট্রের জোগলথেম্বি মুদ্রাভান্ডার থেকে। এখান থেকে আবিষ্কৃত হয় শক ক্ষত্রপনহনানের বিপুল সংখ্যক রৌপমুদ্রা, কিন্তু তাদের উপর গৌতমীপুত্রের মুদ্রার নকশার ছাপ আবার মারা হয়েছিল। এটি নিঃসন্দেহে শক রাজার বিরুদ্ধে গৌতোমীপুত্রের সামরিক সাফল্যের সাক্ষ্য বহন করে।

গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের অন্যতম কৃতিত্ব ছিল পশ্চিম ভারতে শক শাসনের অবসান ঘটানো। এই ঘটনার সরাসরি কোনও প্রমাণ গুপ্ত লেখ তে বলা হয়নি। তার প্রমাণ পাওয়া যাবে মুদ্রায়। শক অধিকৃত পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয় করার পর দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত শকদের রৌপমুদ্রার প্রচলন করেন। মুদ্রার মাধ্যমে এইভাবে দেখানো যায় যে পশ্চিম ভারতে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের গোড়ায় গুপ্ত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

একইভাবে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের এক শ্রেনীর মুদ্রায় রাজার সিংহশিকারী প্রতিকৃত পাওয়া যায়। সিংহ যেহুতু পশ্চিম ভারতের গুজরাট অঞ্চলে সুলভ তাই এই জাতীয় মুদ্রা সম্ভবত ইঙ্গিত দেয় যে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে গুজরাট গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়। প্রাচীনকালে রাজতন্ত্রের পাশাপাশি ভারতে অরাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রচলিত ছিল– এগুলি গণরাজ্য বলে পরিচিত। মৌর্যত্তর আমলে মধ্য ভারতে মালব, অর্জুনায়ন, যৌধেয় প্রভৃতি অরাজতান্ত্রিক গোষ্ঠীগুলির পরিচয় অনেকাংশই বিধৃত আছে তাদের জারি করা তাম্রমুদ্রাগুলিতে।

মুদ্রা আগেই বলা হয়েছে, একপ্রকার ধাতবখণ্ড যা বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত। মুদ্রা তাই অথনৈতিক ইতিহাস–বিশেষত ব্যবসা বাণিজ্যের ইতিহাস চর্চার জন্য এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কোনও সমাজে মুদ্রার ব্যবহার শুরু হলে নিঃসন্দেহে অনুমান করা চলে যে বাণিজ্যের অগ্রগতি ঘটেছে, কারণ লেনদেন আর আদিমতর পণ্য বিনিময় প্রথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ষষ্ঠ ও পঞ্চম শতকে ভারতে যখন প্রথম মুদ্রার দেখা মিলল, ওই সময়ে উত্তর ভারতে ব্যবসা বাণিজ্যের অগ্রগতি প্রতিতা নির্দেশ করে।

মুদ্রার যেমন একটি নির্দিষ্ট ওজন থাকে, তার নির্দিষ্ট ধাতব বিশুদ্ধ বজায় রাখাও একান্ত আবশ্যক। সোনা বা রূপার মতো দামী ধাতুর মুদ্রায় সিংহভাগ ধাতুই হবে সোনা বা রূপা, তার সঙ্গে অল্প পরিমাণে অন্য ধাতুর – যা অপেক্ষাকৃত কম দামি, মিশ্রণ চলতে পারে। মুদ্রার ওজন ও ধাতব বিশুদ্ধভাবে লক্ষণীয় বদল বিশেষত হ্রাস ঘটলে তা অনেক সময়েই আর্থিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এইভাবে স্কন্দগুপ্তের আমলে ক্রমান্বয়ে স্বর্ণমুদ্রায় সোনার পরিমাণ হ্রাস করা হয়। এই ঘটনাটি গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রার অবমূল্যায়নের সাক্ষ্য দেয়, এবং যুক্তিসঙ্গত অনুমান করা হয় যে স্কন্দগুপ্তের পরবর্তী পর্যায়ে গুপ্ত সাম্রাজ্য আর্থিক দুর্গতির শিকার হয়েছিল।


অন্যদিকে, রোম সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের বিবরণ গ্রীক ও লাতিন রচনায় আছে, তার সবচেয়ে বড় চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়া যাবে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত রোমক মুদ্রাভান্ডার থেকে। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক থেকে প্রায় চারশ বছর ভারতে স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রার সংখ্যাল্পতা আমাদের নজর এড়াই না। তার ভিত্তিতে দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বী, রামশরণ শর্মা প্রমুখ ঐতিহাসিক ভারতে ব্যাপক বাণিজ্যিক মন্দা ঘটেছিল বলে রায় দেন, যদিও তাঁদের এই সিদ্ধান্ত সর্বজনসম্মত নয়।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস ছাড়াও প্রাচীন আমলের ধর্মীয় তথা সাংস্কৃতিক ইতিহাস বোঝার জন্য মুদ্রার সাক্ষ্য বিশেষ সহায়ক হয়ে ওঠে। মুদ্রার গৌণ দিকে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি উৎকীর্ণ থাকে। তার দ্বারা কোনও একটি বিশেষ আমলের ধর্মবিশ্বাস ও মূর্তিতত্ত্বের গুরুত্বপুর্ন তথ্য পাওয়া যায়। এই পদ্ধতিতে ব্রাহ্মণ্য মূর্তিতত্ত্বের গবেষণায় মুদ্রার সাক্ষ্য বহুল পরিমাণে ব্যবহার করেছিলেন জিতেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। মুদ্রায় উৎকীর্ণ রাজার প্রতিকৃতি শিল্পশৈলীর সঙ্গে সমকালীন ভাস্কর্যশিল্পের সাযুজ্যত্ত চোখে পড়ে। শিল্প–ইতিহাস অনুধাবনের জন্য মুদ্রার ব্যবহারের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ব্রতিন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।


মুদ্রা যেহুতু ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে দূরদূরান্তে যেতে পারে, তাই কোনও রাজার মুদ্রা কোথাও আবিষ্কৃত হলে তা থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে মুদ্রার প্রাপ্তিস্থানটি মুদ্রা প্রস্তুতকারী রাজার আয়ত্তে ছিল। প্রাচীন বাংলায় কুষাণ মুদ্রার উপস্থিতি থেকে প্রমাণ করা যাবে না যে কুষাণ অধিকার বাংলা পর্যন্ত ছড়িয়েছিল, লেখর প্রাপ্তিস্থানের যে রাজনৈতিক মাত্রা আছে, মুদ্রার প্রাপ্তিস্থানের তা নেই। প্রাচীন মুদ্রার অনুকরণজনিত সমস্যার প্রতিও সজাগ থাকা প্রয়োজন। গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রার আদলে বাংলায় ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে নিকৃষ্ট মানের মুদ্রাও তার পরবর্তী অনুকৃতির পার্থক্য সম্বন্ধে সচেতন থাকেন।

Topics Covered :

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় মুদ্রার গুরুত্ব, প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে মুদ্রার গুরুত্ব আলোচনা করো, ইতিহাসের উপাদান হিসেবে মুদ্রার গুরুত্ব লেখ, ইতিহাসের উপাদান হিসেবে মুদ্রার গুরুত্ব কি, প্রাচীন ভারতের মুদ্রার গুরুত্ব, প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে লিপি ও মুদ্রার গুরুত্ব, ইতিহাসের উপাদান হিসেবে মুদ্রার গুরুত্ব pdf, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় মুদ্রার গুরুত্ব কি

Leave a Comment