সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান (with PDF)

সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান :
আধুনিক সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান

ভূমিকা : উনবিংশ শতকে বিপুল পরিমাণ মননশীল ও সাড়া জাগানো সাংস্কৃতিক কর্মচঞ্চলে ভরপুর ছিল। আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব এবং বিদেশি শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে যাবার চেতনা থেকে শুরু হয় নতুন করে জেগে ওঠার পর্ব। অনেক ভারতীয়রাই পশ্চিমের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিষয়ে হাত মেলাতে অস্বীকার করে। তারা তখনও পরম্পরা গত ভারতীয় ধারা ঐতিহ্য ও প্রতিষ্ঠানের উপরেই আস্থাশীল ছিল। অপরপক্ষে কিছু ভারতীয়রা ছিল যারা আধুনিক পশ্চিম চিন্তাভাবনাকে আত্মস্থ করে নিজেদের সমাজের পুনর্জাগরণ ঘটানোর পক্ষপাতী ছিলেন। এই সাংস্কৃতিক জাগরণে কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন রামমোহন রায়। তাকে যথার্থভাবেই বলা হয়েছে আধুনিক ভারতের প্রথম মহান নেত। দেশবাসীর রাজনৈতিক সামাজিক ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণের জন্য রামমোহন তার সারাটা জীবন ধরে কঠোর পরিশ্রম করে গেছে সমসাময়িক কালের ভারতীয় সমাজের বদ্ধতা ও দুর্নীতির কারণে তিনি অত্যন্ত ব্যথীত হয়েছিলেন। সমাজে সেই সময়ে জাত পাত ও নানা প্রথা সংস্কারেরই দাপট ছিল লোক ধর্ম ছিল সংস্কারে আচ্ছন্ন অজ্ঞ ও  দুর্নীতিগ্রস্ত পুরোহিতরা সেসবের সুযোগ নিয়ে শোষণ চালাতো। মানুষেরা ছিল স্বার্থপর নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ পূরণের জন্য তারা প্রায় সই সামাজিক স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিত। কিন্তু রামমোহন রায়ের অন্তরে ছিল দেশ ও দেশবাসীর জন্য গভীর শ্রদ্ধা ভালোবাসা।

প্রাচ্য পাশ্চত্যের মেলবন্ধন:  প্রাচ্যের দর্শনে ছিল রামমোহনের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা. কিন্তু আবার একই সঙ্গে তার বিশ্বাস ছিল যে আধুনিক সংস্কৃতি ভারতের সমাজের পুনর্জাগরণ ঘটবে। বিশেষ করে তিনি চাইতেন তার দেশের মানুষ যুক্তিশীল ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করুক। তিনি চাইতেন ভারতীয় সমাজে সব পুরুষ ও মহিলারাই যেন সামাজিক ক্ষমতা ও মানবিক মর্যাদা পায়। রামমোহন রায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষার মধ্যে মিলন ঘটাতে চেয়েছিলেন, তিনি পন্ডিত মানুষ ছিলেন, জানতেন বহু ভাষা। তিনি ভারতের ধর্মীয় সম্প্রদায় আন্দোলন সম্বন্ধে ভালোই অবহিত ছিলেন তারপর তিনি পাশ্চাত্য চিন্তা ভাবনা ও সংস্কৃতিকে অধ্যান করেন ও এর মেলবন্ধ ঘটান।

মূর্তি পুজোর বিরোধিতা : ১৮১৪ সালে তিনি কলকাতায় স্থায়ী হয়ে বসবাস করেন। কিছুদিনের মধ্যেই একদল তরুণদের সহযোগিতায় শুরু করেন আত্মীয় সভা। এই সময় থেকে তিনি সামাজিক ও ধর্মীয় কূপপ্রথা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সংগ্রাম চালাতে থাকেন। সেসব কুসংস্কার বাংলার হিন্দুদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল বিশেষ করে তিনি দেবতার মূর্তি পূজোর তীব্র বিরোধিতা করেন। জাতপাতের কঠোরতা, অর্থহীন ধর্মীয় সংস্কারের প্রচলনের বিরোধিতা করেন। তিনি বেদ গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন ও পাঁচটি উপনিষদেরও বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন এবং একেশ্বরবাদ এর স্বপক্ষে সমর্থন জানিয়ে তিনি ধারাবাহিকভাবে অনেক পুস্তিকা রচনা করেন।

আধুনিক যুক্তিচিন্তা : রামমোহন রায় দার্শনিক মতাদর্শের স্বপক্ষে প্রাচীন শাস্ত্র গ্রন্থের উল্লেখ করেছিলেন। তবে মানুষের যুক্তিভিত্তিক ক্ষমতার উপরে তিনি নির্ভর করতেন। তিনি মনে করতেন মানুষের যুক্তি যে কোন মতাদর্শের সত্যতার হদিস দেয় সে মতাদর্শ প্রাচ্যেরই হোক বা পাশ্চাত্যেরই হোক। তিনি বিশ্বাস করতেন যে বেদান্ত দর্শন এই যুক্তির নীতির উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রামমোহন তার যুক্তিশীল দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ কেবলমাত্র ভারতীয় ধর্মগুলি ও ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখেননি, এক্ষেত্রে তিনি তার অনেক মিশনারি বন্ধুদেরও হতাশা ক্লিষ্ট করেন। রামমোহন রায় তার যুক্তিশীল চিন্তাভাবনাকে খ্রিস্ট ধর্মের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেছিলেন। ১৮২০ সালে তিনি তার ‘প্রিন্সেপ্টাস অফ জেসাস’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন|

ধর্মান্ধতা দূরীকরণ : রামমোহন রায়ের প্রভাবে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় তা হল ভারতের নিজের অতীতের উপর অন্ধ নির্ভরতা থাকবে না। আবার পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ হবে না। অন্যদিকে তিনি বলেন যে যুক্তি দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে যা কিছু ভালো আছে তা নতুন ভারতের গ্রহণ করা উচিত তিনি চাইতেন ভারত-পশ্চিম থেকে শিখুক কিন্তু সেই শিক্ষা হবে মরণশীল এবং সৃষ্টিমূলক যার মাধ্যমে ভারতের সংস্কৃতি ও চিন্তাভাবনা নতুন করে সংস্কৃত হয়ে উঠবে। তিনি কখনোই পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে ভারতের উপরে চাপিয়ে দিতে চাননি। তিনি হিন্দু ধর্মের সংস্কার চেয়েছিলেন। এ সময় খ্রিস্ট ধর্ম হিন্দু ধর্মের জায়গা দখল করে নিতে চাইছিল তিনি তারও বিরোধিতা করেন এবং অন্যান্য ধর্মের মধ্যে সামঞ্জস্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ স্থির করেন।

সতীদাহ প্রথার বিরোধিতা : রামমোহন হিন্দু ধর্মের ভিতর থেকে সংস্কার সাধন করতে আরম্ভ করেছিলেন। তিনি ভারতীয় সমাজের সংস্কার সাধনে ও সাধনের ভীত রচনা করেছেন সামাজিক কুসংস্কার ব্যাধির বিরুদ্ধে তার জীবনব্যাপী ক্রুসেডের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল বিধবা মহিলাদের অমানবিকভাবে সতী বানিয়ে দেওয়ার মতো সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম অর্থাৎ এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। এই প্রথা উচ্ছেদে প্রশ্ন তিনি জনমত সংগ্রহ করতে শুরু করেন। 1818 সাল থেকে একদিকে তিনি প্রাচীনতম শাস্ত্র গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি তুলে দেখিয়েছিলেন যে হিন্দু ধর্ম এই প্রথার বিরুদ্ধে। অন্যদিকে তিনি মানুষের যুক্তির কাছে মায়া-মমতার কাছে মানবতার কাছে আবেদন রেখেছিলেন এই সতী প্রথার বিরুদ্ধে। তিনি কলকাতার শ্মশানঘাট প্রদর্শন এ গিয়ে সতীদের আত্মীয়দের বোঝাতে চেষ্টা করতেন তারা যেন সংশ্লিষ্ট মহিলাটিকে আগুনে পুড়িয়ে না মারেন। তিনি সতী বিরোধী মনোভবাপন্ন কিছু লোকজনদেরকেও সংগঠিত করে এবং এই কুকর্ম যাতে না করা হয় তার ওপর নজর রাখেন এবং বলপূর্বক কোন বিধবা মহিলাকে সতী বানানোর চেষ্টা করলে তিনি তার কঠোরভাবে রুখে দাঁড়াতেন। রামমোহনের অনুরোধে বেন্টিঙ্ক সনপ্রথা নিষিদ্ধ করলে গোঁড়া হিন্দুরা এর বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে অভিযোগ করে এবং বলেন যে সতীপ্রথা নিষিদ্ধ করতে বেন্টিঙ্ক এর দেয়া অনুমোদন যেন স্থগিত রাখা হয়। রামমোহন তখন বেন্টিংকের অনুমোদন যাতে স্থগিত না হয় সে ব্যাপারে পাল্টা অভিযোগ করে।

নারী জাতির আধিকার : নারীর অধিকার প্রসঙ্গে রামমোহন ছিলেন একজন নির্ভীক প্রবক্তা। মেয়েদের দমন করে দেওয়ার বিষয়টিকে নিন্দা করতেন তিনি। মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় বুদ্ধিতে এবং নৈতিকতায় নিকৃষ্টতর এমন ধারণা তিনি বিরোধিতা করেন। বহু বিবাহ প্রথাটিকে তিনি আক্রমণ করেন এবং বিধবা মহিলাদের অধঃপতিত অবস্থার বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। মহিলাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়াবার জন্য তিনি দাবি করেন যে মহিলাদেরও উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির অধিকার দেওয়া হোক।

আধুনিক শিক্ষা প্রসার : আধুনিক শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে যারা প্রথম সোচ্চার হয়েছিলেন রামমোহন রায় তাদেরই একজন। দেশের মধ্যে আধুনিক ভাবধারা ছড়িয়ে দেওয়ার সব থেকে বড় উপায় ছিল আধুনিক শিক্ষা। ডেভিড হেয়ারের সাহায্যে তিনি হাজার 1817 সালে প্রতিষ্ঠা করেন তার বিখ্যাত হিন্দু কলেজ। রামমোহন হেয়ার কে শিক্ষামূলক এই কাজে অত্যন্ত উৎসাহ ব্যঞ্জন সহায়তা দেন সেই সঙ্গে তিনি খরচা দিয়ে কলকাতায় একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় চালান যাকে বলা হত হিন্দু স্কুল। এ ভিতরে পাশ্চাত্য শিক্ষায় পড়ানো হতো। 1825 সালে তিনি একটি বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। সেই কলেজে ভারতীয় শিক্ষায় ও পাশ্চাত্য সামাজিক ও ভৌত বিজ্ঞানের পাঠ দেওয়া হতো। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন চর্চার ক্ষেত্রেও কার্য সম্পাদন পুস্তিকা রচনা, পত্রপত্রিকা ইত্যাদির ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছিলেন।

জাতীয় চেতনা উন্মেষ : ভারতের জাতীয় চেতনা উন্মেষের রামমোহন ছিলেন প্রথম আবছা আবাস। এক স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন ছিল তার চিন্তার মূলে। তার কাজের মূল চালিকাশক্তি ভারতের সাংবাদিকতায় রামমোহন রায় ছিলেন অগ্রদূত; বাংলা, ফার্সি, হিন্দি ও ইংরেজি তে তিনি পত্রিকা প্রকাশ করেন এর উদ্দেশ্য ছিল জনসাধারণের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক জ্ঞান বিতরণ করা ও সাধারণ মানুষের দাবি অভিযোগ গুলি সরকারের সামনে তুলে ধরা। তার একটি বিখ্যাত পত্রিকা হল ‘সংবাদ কৌমুদী’।

জাতীয় আন্দলনের সূচনা : দেশের মধ্যে রাজনৈতিক দিক থেকে তিনিই প্রথম গণ্য আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। তিনি বাংলার জমিদারদের দমনপীড়ন মূলক কার্যকর্মের নিন্দা করেন। তিনি দাবি করেন প্রকৃত চাষীরা যে সর্বোচ্চ পরিমাণ খাজনা দিতো সেটি স্থায়ীভাবে আমানত করা হোক যাতে চাষীরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুফল ভোগ করতে পারে। কোম্পানির বাণিজ্যিক অধিকারের অবলুপ্তির দাবি তিনি করেছিলেন। ভারতীয় দ্রব্যসমূহের উপরে উচ্চ হারে রপ্তানি শুল্ক চাপানো ছিল তিনি তারও প্রত্যাহারের দাবি করেছিলেন। রামমোহন রায় আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীতে ছিলেন তীব্র উৎসাহী, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তিনি উদারতা জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্রকে সমর্থন করতেন।

উপসংহার : রামমোহন সিংহের মত নির্ভীক ছিলেন। ন্যায় সঙ্গত কোন কিছুকেই সমর্থন করতে তিনি ইতস্তত বোধ করতেন না। সারা জীবন ধরে তিনি সামাজিক অন্যায় অসাম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। নিজের পরিশ্রম ও বিশাল ক্ষতি স্বীকার করেও তার সমাজ সেবামূলক কাজের ক্ষেত্রে তিনি প্রায়সই পরিবার, ধ্বনি জমিদার, উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও বিদেশী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তেন। ঊনিস শতকের প্রথমার্ধে ভারতীয় আকাশে রামমোহন ছিলেন উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। তবে তিনি এখন নক্ষত্র ছিলেন না; তার অনেক বিশিষ্ট সঙ্গী সাথী ছিলেন এবং ছিলেন অনুসরণকারী। শিক্ষাক্ষেত্রে রামমোহনের পাশে প্রভূত সাহায্য নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ডাচ ঘড়ি প্রস্তুতকারক ডেভিড হেয়ার, আলেকজান্ডার ডাফ এবং রামমোহনের ভারতীয় সন্ন্যাসীদের মধ্যে সবথেকে কাছের ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর । তিনি যে সামাজিক অচলতা এবং গোঁড়াপন্থী বাদীদের বিরোধিতা উপেক্ষা করেও সমাজকে সংস্কারের আলো দেখিয়েছিলেন তার এই সাহস ও আবদান সত্যিই অতুলনীয়।

PDF

<> আরও পড়ুন -> এলাহাবাদ প্রশস্তি 

* Related Keywords :- 

*  রাজা রামমোহন রায়, রাজা রামমোহন রায় এর অবদান, রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা, রাজা রামমোহন রায়ের অবদান pdf, পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা, সমাজ ও শিক্ষা সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান, রাজা রামমোহন রায়ের অবদান, সমাজ সংস্কার আন্দোলনে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা,সমাজ সংস্কারক হিসেবে রাজা রামমোহন রায়, সতীদাহ প্রথার অবসান রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা, রাজা রামমোহন রায় ও সতীদাহ প্রথা, সমাজ সংস্কারে রামমোহন রায়ের ভূমিকা, রাজা রামমোহন রায়ের ধর্ম সংস্কার “

Leave a Comment