মুঘল চিত্রকলা

  • মুঘল চিত্রকলার পরিচয় দাও

ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে মুঘল যুগ নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে। চিত্রকলার ক্ষেত্রে মুঘলরা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল। তারা দরবার, যুদ্ধের দৃশ্য, নতুন বিষয়, নতুন রং ও নতুন আঙ্গিকের রচনা করেছিল। চিত্রকলা এক জীবন্ত পরম্পরায় উন্নীত হয়েছিল মুঘল যুগে। এ যুগের চিত্রকলার আঙ্গিকেও পরিবর্তন আসে যার উল্লেখযোগ্য দুটি ভাগ হলো দরবারি চিত্রকলা ও প্রাদেশিক চিত্রকলা।

  • দরবারি চিত্রকলা : চিত্রকলা পঞ্চদা শতক উক্তি দেশী ও প্রাদেশিক রীতিতে চিত্রাঙ্কন বহুলভাবে প্রচলিত ছিল তবে আকবরের আমলে চিত্রকলার পুনরুজ্জীবন শুরু হয়েছিল তার পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে। ইরানের শাহের দরবারে থাকার সময় আকবরের পিতা হুমায়ুন দুজন চিত্রশিল্পীকে তার সঙ্গে
    দরবারি চিত্রকলা
    দরবারি চিত্রকলা

    করে ভারতে নিয়ে আসেন। আকবরের আমলে তাদের নেতৃত্বে একটি প্রতিষ্ঠানে ছবি আঁকার আয়োজন করা হয়। তাদের এই প্রাতিষ্ঠানিক রীতি পরবর্তীতে দরবারী চিত্রকলার রীতি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। এই প্রতিষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বহু চিত্রশিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল যাদের বেশির ভাগই ছিল নিচু জাতের লোক। ফলত এই ঘরানাটি দ্রুত বিকাশ লাভ করে এবং শীঘ্রই একটি বিখ্যাত চিত্র উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। আকবরের দরবারে এই ঘরানার দুজন বিখ্যাত চিত্রকর ছিলেন যশবন্তদসয়ন

  • প্রাদেশিক রীতি : মুঘল দরবারি চিত্রকলার প্রভাব কিছু পরিমাণে অন্যান্য প্রদেশের চিত্রকলার মধ্যেও পাওয়া যায় তবে দরবারি রীতি থেকে এর পার্থক্য হল এদের স্বকীয় কিছু বৈশিষ্ট্য। মুঘল আঙ্গিকের
    প্রাদেশিক চিত্রকলা
    প্রাদেশিক চিত্রকলা

    তুলনায় বিজাপুর গোলকুণ্ডা ও আহমেদনগরে যে ক্ষণস্থায়ী চিত্রশৈলী গড়ে উঠেছিল সেগুলির রঙের ব্যবহার ও অলংকার মুঘল শৈলী থেকে আলাদা ছিল। এগুলির মধ্যে যে কাব্যিক ধরন আছে তা মুঘল চিত্রকলায় পাওয়া যায় না। এইভাবে মুঘল চিত্রশৈলীর সাথে কিছু স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে গড়ে উঠেছিল প্রাদেশিক চিত্রশৈলী যার এক এক প্রদেশে তার স্বকীয়তার বৈশিষ্ট্য ভিন্নরকম ছিল। এই ধরনের চিত্রশিল্পের নিদর্শন হলো দাক্ষিণাত্যে প্রাপ্ত “তারিখই-হোসেনশাহী” ।

মুঘল চিত্রকলার উল্লেখযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যা একে অন্যান্য চিত্রশিল্পের থেকে পৃথক করে। এর মূল বৈশিষ্ট্য হল এখানে দেশীয় ও পারসিক রীতির অসাধারণ সংমিশ্রণে সৃষ্ট ইন্দো-পারসিক রীতির ব্যবহার। প্রথমদিকে এই চিত্রকলার মূল বিষয় হিসেবে উঠে আসত বিভিন্ন লোককথা, লোকউৎসব, প্রাকৃতিক দৃশ্য, গাছপালা, পশু-পাখি ইত্যাদি। পরবর্তীতে রাজদরবার ও ক্রমশ কঠোর বাস্তব জীবন হয়ে ওঠে এর মূল উপজীব্য বিষয়। ছোট পরিসরের চিত্রাঙ্কন ছিল এ যুগের চিত্রকলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ধীরে ধীরে এই রীতিতে পারস্য প্রভাব কমে এসে ভারতীয় বিষয়বস্তু অনুপ্রবেশ ঘটে। বিভিন্ন ভারতীয় রঙ এতে ব্যবহৃত হতে থাকে। আকবরের পরবর্তীকাল থেকে বিভিন্ন ইউরোপীয় রীতি মুঘল চিত্রকলার যুক্ত হতে থাকে যা এযুগের চিত্রকলাকে একটি মাত্রা দিয়েছিল।

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর ছিলেন সৌন্দর্যের পূজারী। তিনি ছিলেন চিত্রকলার উৎসাহী সমর্থক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রকৃতি, তার শস্য-শ্যামলা রূপ বাবরের মনকে উজ্জীবিত করেছিল। তাই তিনি দরবারের শিল্পী নিয়োগ করেছিলেন। হুমায়ূনের ভাগ্য বিপর্যয় ও পারস্যে তার আশ্রয়ে মুঘল চিত্রকলার বিকাশে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। পারস্যে থাকাকালীন হুমায়ুনের সাথে পরিচয় হয় সে যুগের বিখ্যাত দুই চিত্রশিল্পী সৈয়দ তাবরিজি ও আব্দুস সামাদের সাথে। তারা ‘দস্তানআমিরহামজা’ নামে যে পারসিক রীতিতে ছবি আঁকতেন তা হুমায়ুনের মনে ধরে। পরবর্তীতে আকবরের আমলে তাদের জন্য একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। আকবরের আমল থেকেই মুঘল চিত্রকলার প্রকৃত পুনরুজ্জীবন ঘটতে থাকে। আবুল ফজল এর বিবরণ থেকে জানা যায়, সম্রাট প্রতি সপ্তাহে একবার শিল্পীদের আকা চিত্রগুলিকে পরীক্ষা করতেন। এ যুগে মুসলিমদের তুলনায় হিন্দু সম্প্রদায় চিত্রকলার অধিক সক্রিয় অংশ নিয়েছিল।

মুঘল চিত্রকলা
মুঘল চিত্রকলার অনন্য নিদর্শন

জাহাঙ্গীর ছিলেন চিত্রকলার প্রকৃত সমঝদার। মুঘল চিত্রকলা জাহাঙ্গীরের অধীনে এক শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছিল। তার ছিল জহুরীর চোখ। জাহাঙ্গীর দাবি করতেন যে তিনি একটি ছবির মধ্যে প্রত্যেক শিল্পীর কাজ আলাদা করে চিনতে পারতেন। জাহাঙ্গীরের আমলে শিকার, যুদ্ধ ও দরবার দৃশ্য ছাড়াও প্রতিকৃতি ও জীবজন্তুর ছবি আকার বিশেষ অগ্রগতি ঘটেছিল। জাহাঙ্গীরের আমলেই মুঘল চিত্রকলায় পারসিক রীতির সাথে ভারতীয় রীতির বিকাশ ঘটেছিল।

শাহজাহান ছিলেন স্থাপত্য শিল্পের অনুরাগী। স্থাপত্য শিল্পে অত্যাধিক অনুরাগের কারণে তিনি চিত্রশিল্পে সেভাবে গুরুত্ব দিতে পারেননি। এই সময় চিত্রশিল্পে অপেক্ষাকৃত রংয়ের আধিক্য ও আড়ম্বর পরিলক্ষিত হয়। আকবরের আমলে পর্তুগিজদের দ্বারা একপ্রকার চিত্রকলা প্রচলিত হয়েছিল যেখানে কাছের বস্তুকে ও দূরের বস্তুকে একটি প্রেক্ষিতে দেখা যায়। শাহজাহানের আমলে এই পরম্পরা জারি ছিল।

মুঘল বাদশাদের মধ্যে ঔরঙ্গজেব-ই ছিলেন ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ। তিনি ছিলেন কঠোর ধার্মিক ও ধর্মের বিধিনিষেধ তার কাছে ছিল কর্তব্য। মূলত শাহজাহানের আমল থেকে চিত্রশিল্পে যে আবক্ষয়ের সূচনা হয়েছিল, ওরঙ্গজেবের আমলে সে অবক্ষয় পরিণতি লাভ করে। তার অত্যাধিক ধর্মীপ্রীতির কারণে তিনি চিত্রকলায় আগ্রহ দেখাননি বরং তিনি চিত্রবিভাগই বন্ধ করে দেন। ফলে শিল্পীরা তাদের স্থান হারিয়ে বিভিন্ন প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক দরবারে আশ্রয় নিতে থাকে। এভাবেই উজ্জ্বলতার সাথে টিকে থাকা মুঘল চিত্রশিল্প ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে পড়ে।

PDF

* আরও পড়ুন- নূরজাহান চক্র

F.A.Q.

  • মুঘল চিত্রকলা দুজন শিল্পীর নাম লেখো। 

উঃ  আকবরের দরবারে দুজন বিখ্যাত চিত্রকর ছিলেন যশবন্তদসয়ন

1 thought on “মুঘল চিত্রকলা”

Leave a Comment