নূরজাহান চক্র কী

নূরজাহান চক্র

নূরজাহান চক্র কী : 

ভারতের ইতিহাসে যে সকল বিচক্ষণ ও প্রভাবশালী নারীর কথা আমরা জানতে পারি তাদের মধ্যে নূরজাহান ছিলেন মধ্যযুগের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন প্রজাদরতী ও বহুমুখী গুণের অধিকারিনী। রাজনৈতিক কৌশলে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধূরন্ধর ও পারদর্শী। জাহাঙ্গীরের সাথে বিবাহের পরবর্তীকালে তার দুর্বলতা ও অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে দরবার ও মুঘল প্রশাসনে সীমাহীন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। তিনি ক্রমেই প্রশাসনের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন। জাহাঙ্গীরের অন্ধ পত্নীপ্রেমের সুযোগে উচ্চাকাঙ্ক্ষী নূরজাহান তার নিকটজনদের নিয়ে তার অনুগত একটি জোট বা জুন্টা তৈরি করেন। মোগল সাম্রাজ্যের প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকারী এই জোটকে নূরজাহান চক্র বা নূরজাহান জুন্টা নামে পরিচিত। এই জুন্টার সদস্যদের মধ্যে ছিলেন তার পিতা মির্জা গিয়াস বেগ বা ইতিমাদউদ্দৌলা, ভ্রাতা আসিফ খান ও ইদমত খাঁ, মহব্বত খাঁ ও যুবরাজ খুররম যিনি পরবর্তীকালে শাহাজাহান রূপে পরিচিত হন। বর্তমানকালের ঐতিহাসিক বেনীপ্রসাদ প্রথম এই নূরজাহান চক্রের কথা তুলে ধরেন। এই জুন্টা শুরু হয় নূরজাহানের সাথে জাহাঙ্গীরের বিবাহের পর ক্রমাগত এই জুনটা প্রসার লাভ করে এবং ১৬২০ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে।

 

পরিচয় :

   নূরজাহান নামে খ্যাত জাহাঙ্গীরের এই প্রিয়তমা পত্নীর প্রকৃত নাম মেহেরুন্নিসা। ১৮ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় আলি কুলি বেগের সাথে। তার হত্যার পর মিনা বাজারে নূরজাহানকে দেখে মুগ্ধ হয়ে ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীর থাকে বিবাহ করেন। তিনি একদিকে যেমন প্রবল বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমতী ছিলেন তেমনি ছিলেন অসাধারণ রূপের অধিকারিনী। তার রূপের গুণে মুগ্ধ হয়ে জাহাঙ্গীর তাকে প্রথমে নূরমহল (মহলের আলো) ও পরবর্তীতে নূরজাহান (জগতের আলো)  নামে আখ্যা দেন। জাহাঙ্গীরের সাথে তার বিবাহের ফলে তার পিতা ইতিমাদউদ্দৌলার দ্রুত পদোন্নতি হয় ও তাকে প্রধান দেওয়ানের পদে উন্নীত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি উজির বা প্রধানমন্ত্রী রূপে আবর্তিত হন। তিনি যথেষ্ট দক্ষ ও সক্ষম অনুগত হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। নূরজাহানের ভাই আসফ খাঁ কে খান ই জামান পদ দেওয়া হয়। যেসব অভিজাতদের প্রতি বাদশাহের পূর্ণ আস্থা থাকত তাদের এই পদ দেওয়া হতো। জাহাঙ্গীরের সাথে নূরজাহানের বিবাহ যে তার পরিবারের পক্ষে সুফলদায়ক হয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। শাহজাহানকে নিজের দলে টানার জন্য বিচক্ষণ নুরজাহান ভ্রাতুষ্পুত্রী আরজুমন্দ বানু বেগমের সাথে তার বিয়ে দেন। এরফলে তার যেমন জোটের আনুগত্য বাড়ে তেমনি ক্ষমতার সম্প্রসারণ হয়। এভাবে একে একে মহাবত খাঁর মত বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নিজের দলে টানতে থাকেন। এই জুন্টা বিভিন্ন খালি পদে তাদের অনুগত লোক নিয়োগ করতে থাকে। তার ফলে দরবারে তাদের প্রশাসন পরিচালনায় ও নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হয়। জাহাঙ্গীর ক্রমে আমোদপ্রমোদ ও বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে পড়লে মোগল শাসন ও রাজনীতিতে নূরজাহানের কর্তৃত্ব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। অসুস্থ সুরাশক্ত জাহাঙ্গীর একটা সময় নুরজাহানের হাতের পুতুলে পরিণত হয় এবং নূরজাহান সিংহাসনের চালিকা শক্তরূপে আত্মপ্রকাশ করে। জাহাঙ্গীর নিজেই এক সময় মন্তব্য করে বলেন, “আমি এক পেয়ালা সুরার বিনিময়ে আমার রাজ্য আমার প্রিয়তমা রানীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।”

   বর্তমানকালের ঐতিহাসিকরা দাবি করেন নূরজাহানের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্রাট ও শাহজাহানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল। ফলে 1622 সালে শাহজাহান বাবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বাধ্য হন। কারণ তিনি মনে করতেন জাহাঙ্গীর সম্পূর্ণ রূপে নূরজাহানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। শাহাজাহানের সিংহাসন লাভের আশা যখন ক্রমশ বেড়ে গেল, তখন শেষমেষ তাকে বসে করার না গেলে জাহাঙ্গীরের কনিষ্ঠপুত্র শাহরিয়ার সাথে নূরজাহান তার কন্যা লাডলি বেগমের বিয়ে দেন। শাহরিয়ার কে দিল্লির সিংহাসনে বসানোর পরিকল্পনা হচ্ছে দেখে শাহাজাহান ক্ষুব্ধ হন এবং নুরজাহান চক্র থেকে বেরিয়ে আসেন। এ অবস্থায় নুরজাহান চক্র দুই গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে যায় একদিকে ছিল নূরজাহান জুন্টার লোকজন ও অপরদিকে যুবরাজ খোররম এর নেতৃত্বে তার বিরোধী গোষ্ঠী।

   শেষের দিকে নূরজাহান প্রচন্ড উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠেন। জাহাঙ্গীরের সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিলেন নূরজাহান। এমনকি তিনি জাহাঙ্গীরের সাথে শিকারে যেতেন। তিনি নিশানাবাজিতে ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী। বলা হয় নূরজাহান ঝরোকাতে বসে আদেশ দিতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ খবর নিতে ভুলতেন না। কখনো কখনো তার নামে ফরমান জারি করা হয়ে থাকতো। রাজকীয় হারেমকে তিনি তার কুক্ষিগত করতে সমর্থ্ হয়েছিলেন। ঐতিহাসিকদের পক্ষে সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর বিষয় হলো তার নামাঙ্কিত মুদ্রা, দাম, দিরহাম ও রূপির প্রচলন। মুদ্রাতে তার উপাধি থাকত ‘বাদশাহ বেগম’ নামে। দরবারের রাজনীতি ও কর্তৃত্বে তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন এ ছিল তার দৃষ্টান্তমূলক প্রতিফলন। তবে এর কোনো প্রমাণ নেই যে ১৬১১ থেকে ১৬২২ সালের মধ্যে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ঐতিহাসিক বেনীপ্রসাদ বলেছেন জাহাঙ্গীর বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতি আগের মতই বহাল ছিল। নূরজাহান তার সদস্যরা জাহাঙ্গীরকে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে তাকে দিয়ে সব কাজ সিদ্ধ করে নেওয়ার চেষ্টা করতেন। নূরজাহান কোনো দক্ষ স্বাধীনচেতা অভিজাত বা সেনাপতিকে সহ্য করতে পারতেন না। তাদের তিনি নানাভাবে অপদস্ত করতেন। শাহজাহান ও মহবত খানের বিদ্রোহ ছিল তার এই দুর্ব্যবহারের ফল।

   শাহজাহানের নিয়মিত অভিযোগ ছিল সম্রাটের অসুস্থতার কারণে সব কার্যকর ক্ষমতা নূরজাহান বেগমের হাতে চলে যাচ্ছে। এই অছিলায় তিনি চার বছর ধরে বিদ্রোহ করতে থাকেন। তার এই অভিযোগ মেনে নেওয়া কঠিন ছিল কারণ শাহজাহানের শ্বশুর ছিলেন বাদশাহি দিওয়ান। তাছাড়া শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও জাহাঙ্গির মানসিকভাবে আত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তার অনুমতি ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত না। তাছাড়া এমন অনেক অভিজাত ছিলেন যারা নূরজাহান চক্রের বাইরে অথবা বিরোধী থাকা সত্ত্বেও তাদের সম্রাট পদোন্নতি করেছেন। এমতাবস্থায় সম্রাটের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে মহব্বত খাঁ সর্বোচ্চ ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত  করার চেষ্টা করলেন। সম্রাটকে শিকারের বাহানায় নিয়ে গিয়ে বন্দী করে ফেলেন।নূরজাহান তাৎক্ষনিক বন্দি না হলেও পালিয়ে যান ও মহাবত খানের বিরুদ্ধে তার আকস্মিক আক্রমণ গড়ে তোলেন। এই আক্রমন ব্যর্থ হলে নূরজাহান মহাব্বত খাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। নূরজাহান তার কূটনৈতিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে অচিরেই টাকা-পয়সা ও উঁচু পদের লোভ দেখিয়ে মহাব্বত খানের পক্ষে থাকা সকল অভিজাতদেরকে নিজের দলের টেনে নিলেন। মহাব্বত খাঁ ছিলেন একজন সৈনিক মাত্র। রাজনীতির জটিল কৌশলে তিনি পারদর্শী ছিলেন না। অভিজাতরা তার বিরুদ্ধে হলে তিনি বিপদ সংকেত বুঝে সেখান থেকে পালিয়ে যান এবং খুররমের সাথে যোগ দেন। অবশেষে ১৬২২ সালে খুররমের বিদ্রোহের মাধ্যমে এই চক্রের ও তার চক্রান্তের চিরসমাপ্তি ঘটে।

   বর্তমানকালে নূরজাহান চক্রের অস্তিত্বের বিপক্ষে ঐতিহাসিক নুরুল হাসান জোরালো মত রেখেছেন তার মতে নূরজাহানের পরিবারের লোকজনের উচ্চপদে বহাল হওয়ার জন্য তিনি কখনোই দায়ী নন। তার আগে থেকেই ইতিমাদউদ্দৌলা ও ওই সময়ের আরো অনেক অভজাত পরিবার মুঘল দরবারে উচ্চ পদ লাভ করেছিলেন। মহাব্বত খাঁর মতো জাইগিরদার জুন্টার বিপক্ষে হওয়া সত্বেও তার প্রতি জাহাঙ্গীরের নেক নজর ছিল। এরকম আরো অনেকেই জুন্টার লোক না হয়েও সম্রাটের প্রিয় পাত্র ছিলেন। নুরুল হাসান বলেন নূরজাহান ও শাহজাহানের মধ্যে শত্রুতার কথা বলা হয় তার কোন প্রমাণ প্রামাণ্য দলিল নেই একমাত্র টমাস রো এই কথা বলেন যা ছিল গুজবের উপর নির্ভরশীল। ইরফান হাবিব তার সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে দেখিয়েছেন যে মুঘল অভিজাতরা দুটি গোষ্ঠীতে ভাগ হয়েছিল এটা বলা যায় না। অর্থাৎ পুরনো অভিযাত্রা নূরজাহানের বিরুদ্ধে ছিল তার কোনো প্রমাণ নেই। কোনো অভিজাতই অন্য কোনো অভিজাতকে ক্ষমতাশালী হতে দিতে চাইতেন না। এই কারণে তাদের মধ্যে ক্ষমতার পারস্পারিক দ্বন্দ্ব লেগেই থাকত। ডক্টর ত্রিপাঠী বলেন, যুক্তি দিয়ে বিচার করলে নূরজাহানকে জাহাঙ্গীর সিংহাসনের পশ্চাতে অশুভ শক্তি না বলে সৌভাগ্যসূচক শক্তি বলা যেতে পারে। কারণ নুরজাহানের সংসর্গে এসে জাহাঙ্গীর ব্যক্তিগত জীবনে সংযমী হতে চেষ্টা করেন এবং সাম্রাজ্যের বিভিন্ন সমস্যাতে তার সহযোগিতা পেয়ে তিনি সেগুলি ভালোভাবে সমাধান করতে সক্ষম হন। তার প্রভাবে জাহাঙ্গীর শিক্ষা ও সংস্কৃতির দিকে অধিক মনোযোগী হন। নূরজাহান নারীদের মর্যাদা রক্ষা ও দীন দুঃখীদের দুর্দশা দূর করার জন্য সচেষ্ট হন।ডঃ ঈসবরিপ্রসাদ জাহাঙ্গীরের উপর তার এই অবাধ প্রভাবকে মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষে সুনজরে দেখেননি।

  নূরজাহান চক্র কী এবং এই চক্রের মতবাদ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও, নূরজাহান যে জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় দরবারী প্রশাসনে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা সকলে মেনে নিয়েছেন। ১৯২২ সালের পর হঠাৎ যখন জাহাঙ্গীরের শরীর ভেঙে পড়ে সেই সুযোগে একদিকে খুররম বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং ইতিমাদউদ্দৌলার গত হওয়ার সুযোগ নিয়ে অপরদিকে মহব্বত খাঁর মতো অভিজাতরা যখন জাহাঙ্গীরকে হাতের পুতুল বানিয়ে ক্ষমতা পাওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন নূরজাহান সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। তিনি তার স্থির বিচক্ষণতা ও কূটনৈতিক বুদ্ধির দ্বারা এই সংকটকালীন অবস্থাকে শান্ত মাথায় নিয়ন্ত্রণ করেন গেছেন। এ সময় তাকে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। উনি নামে ছাড়া সবদিক থেকে ছিলেন বাদশাহ স্বরূপ। উল্লেখ্য, সিংহাসনে নতুন ও যোগ্য সম্রাট বসা না পর্যন্ত হারেম থেকে সিংহাসন, দরবার থেকে প্রশাসন সব জায়গায় তিনি সাফল্যের সাথে নিয়ন্ত্রণ করে গেছেন। গল্পকথায় বিষধর সর্প যেমন অতি মূল্যবান সম্পদকে পাহারা দেওয়ার কথা শোনা যায় তেমনি যেন মোঘল যুগের এক সংকটকালীন সময়ে রাজ সিংহাসনের পাহারাদার রূপে আবির্ভুত হয়েছিলেন  নূরজাহান। তার বিচক্ষণতা ও কূটনৈতিক কলাকৌশল মুঘল তথা মধ্যযুগের ইতিহাসে ছিল বিস্ময় স্বরূপ।

   তবে সিংহাসনের পক্ষে হিতকর হলেও প্রতিটা সর্পের মতো এ সর্পের বিষে মুঘল সাম্রাজ্য ও রাজ দরবারের পরিবেশ ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে ওঠে। তিনি দল ও গোষ্ঠী তৈরি করে শাসনব্যবস্থায় ঐক্য নষ্ট করেন। জাহাঙ্গীর তার রাজত্বের শুরুতে যে ন্যায়বিচার প্রবর্তন করেন তা ধ্বংস হয়। আগ্রার দরবার সন্ত্রাস গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও সন্ত্রাসকারীদের লীলাভূমিতে পরিণত হয়।

Leave a Comment