চন্দ্রকেতুগড় : প্রাচীন বাংলার বিস্মৃত বন্দর-নগর

চন্দ্রকেতুগড়ঃ প্রাচীন বাংলার বিস্মৃত বন্দর-নগর

  প্রাচীন বাংলা সম্পর্কে আমাদের জানতে গেলে প্রাচীনকালে বাংলা আদতে কোন অংশটুকু ছিল তার ধারণা থাকা উচিত। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যাকে বাংলা বা বঙ্গভূমি হিসেবে দেখছি প্রাচীনকালে তেমনটা ছিল না। বাংলা ছিল বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত। পুণ্ড্রবর্ধন, অঙ্গ, সমতট রাঢ়, গৌড় ও বঙ্গ এগুলি ছিল তখনকার অঞ্চল। এগুলি নিয়েই প্রাচীন বাংলা গঠিত ছিল। আলেকজান্ডারের আক্রমণ কালে বঙ্গভূমির চারটি প্রাচীন ভুভাগ স্বতন্ত্র নামে পরিচিত ছিল। তথা বঙ্গ, পুণ্ড্র, তাম্রলিপ্ত ও সুহ্ম বা রাঢ় উত্তর-পশ্চিম ভারতবাসীর কাছে মোটামুটি পরিচিতি ছিল মহাভারতে এর উল্লেখের কারণে।  প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের রাঢ-গৌর-পুন্ড্র-তাম্রলিপ্ত সমন্বিত এই বঙ্গভূমিকেই বলা হত গঙ্গাহৃদি। এই গঙ্গাহৃদি বলতে গঙ্গাবক্ষের বদ্বীপ অঞ্চল কে বোঝানো হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই গঙ্গাহৃদিই গ্রিক পর্যটকের ভাষায় হয়ে ওঠে গঙ্গারিডি বা গঙ্গারিডাই। প্রাচীনকালের যে গঙ্গারিডাই রাজ্যের প্রতাপে ভীত-সন্তস্ত্র হয়ে আলেকজান্ডার পূর্ব দিকে অগ্রসর হননি সেই গঙ্গাহৃদির প্রাণকেন্দ্র তথা রাজধানী বা বন্দর-নগর ছিল চন্দ্রকেতুগড়।

প্রচলিত লোককাহিনি ও চন্দ্রকেতু সমস্যা:

   চন্দ্রকেতুগড়ের নাম ও রাজা চন্দ্রকেতুকে নিয়ে নানান কল্পকাহিনী ও লোককথা প্রচলিত আছে।  বলা হয় রামচন্দ্রের ভ্রাতা লক্ষণের দ্বিতীয় পুত্র চন্দ্রকেতু ছিলেন মল্লভূমের রাজা, চন্দ্রকান্তা নগরী ছিল তার রাজধানী। আবার হোসেন শাহ মল্লভূমি দখলের পূর্বে রাজা চন্দ্রকেতু ও তার বংশধরেরা দেড়শ বছর রাজত্ব করেন বলে জানা যায়। বলা হয় জনৈক রাজপুত তীর্থ করে ফেরার পথে মেদিনীপুরে বসবাসকালে নিজের নাম অনুসারে সেই জায়গার নাম দেন চন্দ্রানগরী। তার প্রপৌত্র দ্বিতীয় চন্দ্রকেতুর রাজত্বকালে এটা চন্দ্রকোনায় রূপান্তরিত হয়। কিন্ত প্রকৃত চন্দ্রকেতুগড় থেকে এর দূরত্ব ১৩৭ কিমি।

   তবে চন্দ্রকেতুগড় ও চন্দ্রকেতুকে নিয়ে সর্বাধিক জনপ্রিয় লোককথা তথা কিংবদন্তি হল চন্দ্রকেতু ও পীর গোরাচাঁদের কাহিনী। পীর গোরাচাঁদ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আরব ভূখণ্ড থেকে বাংলায় আসেন। তিনি ছিলেন একজন সুফি সন্ত। চতুর্দশ শতকের গোড়ার দিকে তিনি তার ২১ জন আউলিয়া সঙ্গীদের সঙ্গে নিয়ে সাবেক ২৪ পরগনার বালান্দা পরগনায় আসেন ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে। বলা হয় তিনি ছিলেন অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষ। তার প্রকৃত নাম ছিল সৈয়দ আব্বাস আলী। কাহিনী আনুসারে পদ্মা নদী পার হয়ে এওয়াজপুর গ্রামে আসার সময় নদীর প্রাকৃতিক বিরোধিতায় তিনি রুষ্ট হয়ে অভিশাপ দেন যার ফলে বিশাল পদ্মা নদী শুকিয়ে যায়। এই লোককথা অনুসারে সন্নিকটে অবস্থিত দেউলিয়া বা দেবালয়ের রাজা চন্দ্রকেতুকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য তিনি অনুরোধ করলে রাজা চন্দ্রকেতু তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং তিনি প্রকৃত পীর কিনা এবং তার অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় পেতে নানা কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করে রাজা চন্দ্রকেতুর লোহার কলা কে সত্যিকারের পাকা কলায় রূপান্তরিত করেন। বলা হয় একই সাথে তিনি রাজপ্রাসাদের সমস্ত লোহার বেড়ায় চাঁপা ফুল ফুটিয়ে তোলেন, যা থেকে পরবর্তীকালে ওই এলাকার নাম হয় বেড়াচাঁপা।

চন্দ্রকেতু তাতেও নতি স্বীকার করে ধর্মান্তরিত হলেন না। অবশেষে গৌড়ের বাদশা চন্দ্রকেতুকে ধর্মান্তরিত হওয়ার নির্দেশ দিলে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বাধে। যুদ্ধের আগে তিনি নগরবাসী ও রানীকে বলে যান তিনি বিজয়ী হলে সাদা পায়রা এবং পরাজিত হলে নগরের উদ্দেশ্যে কালো পায়রা উড়িয়ে দেওয়া হবে। চাপাতলার রণখেলায় দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ চলাকালীন চন্দ্রকেতুর বিজয় যখন অবসম্ভাবী, তখন পীর গোরাচাঁদ যাদু বলে কালো পায়রা নগরের উদ্দেশ্যে উড়িয়ে দেন। তা দেখে নগরবাসী বিমর্ষ হয়ে পড়ে এবং রানী দুঃখে গ্লানিতে পদ্মদহে ডুবে আত্মহত্যা করেন। রাজা চন্দ্রকেতুর কাছে এই খবর পৌঁছাতেই তিনি মনোবল হারিয়ে যুদ্ধে পরাজয় বরণ করেন। পরাজিত রাজা চন্দ্রকেতু রাজ্যে ফিরে পদ্মদহে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেন।

   বসিরহাটের হাড়োয়ায় বিদ্যাধরী নদীর তীরে পীর গোরাচাঁদের সমাধি বা দরগা এখনো আছে। যেখানে আজও হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল মানুষ তাকে শ্রদ্ধা ভক্তি করে।

   গ্রিক লেখকগণ প্রাচ্যের রাজাকে স্যান্ড্রোকোট্টাস(Sandrokottos, Sandrakottas) নামে অভিহিত করেন। অনেকের মতে এই স্যান্ড্রোকোট্টাস চন্দ্রগুপ্ত না, আসলে এটা হল চন্দ্রকেতুর গ্রিক উচ্চারন। কিন্তু এখানে মনে রাখা উচিত প্রাসী(প্রাসাই) বা প্রাচ্যের যে রাজাকে গ্রিক লেখকগণেরা স্যান্ড্রোকোট্টাস বলেছেন তার রাজধানী পালিবোথরা(Palibothra)। এই পালিবোথরা হল পাটলিপুত্র; বর্তমান পাটনা। আবার চন্দ্রকেতুগড়কে যে প্রাচীন গঙ্গাহৃদির রাজধানী বলা হয়েছে, আলেকজান্ডারের সময়কালে সেখানে রাজত্ব করতেন Xandremmes বা Agrammes। এই নামটি ঔগসৈন্য নামটির গ্রিক বিকৃতি। মহাপদ্মানন্দকে বৌদ্ধ গ্রন্থ দীপবংশে উগ্রসেন বলা হয়েছে। সংস্কৃত গ্রন্থের নিরিখে মহাপদ্মানন্দের পুত্র ধননন্দকে ঔগসৈন্য বা আগ্রামেস(Agrammes) বলা হয়েছে।

   আবার বরাহমিহিরের কিংবদন্তি থেকে জানা যায় চন্দ্রকেতু ছিলেন গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের অধীনস্থ একজন রাজা। বাংলা বিহারের এই ঢিবির কোথাও দ্বিতীয় উল্লেখ নেই। খনা-মিহিরের ঢিবির সত্যতা প্রমানিত; তাদের আগমনের ঘটনা সত্য হলে গ্রিক বিবরণীর স্যান্ড্রোকোট্টাস কখনোই চন্দ্রকেতু হতে পারে না। তিনি ছিলেন গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের আধীন একজন প্রাদেশিক রাজা মাত্র।

   তাহলে প্রশ্ন হল , যার নামে এই উন্নত বন্দর নগরীর নাম সেই চন্দ্রকেতু আসলে কে ছিলেন?

   এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। এখানে মূল সমস্যাটি হল বিভিন্ন লোককাহিনী ও কিংবদন্তি অনুসারে চন্দ্রকেতুর যে বর্ণনা বা অস্তিত্বের কথা বলা হয় তা বিভিন্ন কিংবদন্তি অনুসারে বিভিন্ন সময়কে নির্দেশ করে।

অবস্থান ও গড়ের পরিচিতি :

   কলকাতা থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাংলার এই প্রাচীন বন্দর-নগর। ১৯০৬ সালে তারকনাথ ঘোষ ও স্থানীয় কিছু মানুষ চন্দ্রকেতুগড়ে পুরাতাত্ত্বিক পরিদর্শনের জন্য আবেদন জানান। তৎকালীন ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বক্ষণের পূর্ব শাখার সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছিলেন মিস্টার লংহার্স্ট। ১৯০৭ সালে পরিদর্শনের কাজ সম্পন্ন হলেও তিনি এই অঞ্চলের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেননি। পরবর্তীকালে ১৯০৯ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এর প্রাচীনত্ব ও সঠিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে এর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা দেন। কিন্তু সে সময় মূল্যবান বস্তু সামগ্রী পাওয়া গেলেও উৎখননের কাজ শুরু হয় প্রায় 48 বছর পর। উৎখননের  ফলে নগরায়নের ধ্বংসাবশেষ প্রাক মৌর্য্য থেকে শুরু করে পালযুগ পর্যন্ত সাতটি স্তরের হদিস পাওয়া গেছে।

চন্দ্রকেতুগড়

  

দক্ষিণের সাগরদ্বীপ-সুন্দরবন থেকে উত্তর ২৪ পরগনা এলাকা জুড়ে প্রাচীন গঙ্গারিডি রাজ্য বিস্তৃত ছিল। অনেকের মতে এই চন্দ্রকেতুগড় ছিল তার রাজধানী। এর বর্তমান অবস্থান উত্তর ২৪ পরগনার বেড়াচাঁপা হলেও একদা এই চন্দ্রকেতুগড় ছিল বৃহত্তর নদীয়ার একটি অংশ। বৃহত্তর নদীয়া বলতে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের আদি সপ্তগ্রাম থেকে বাংলাদেশের মেঘনা পর্যন্ত ছিল তার বিস্তৃতি। এখান থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিদ্যাধরী নদীর খাতেই গঙ্গার সাথে চন্দ্রকেতুগড়ের যোগাযোগ ছিল। সেই সময় ভাগীরথী ছিল গঙ্গার প্রধান শাখা যা এই নগরীকে জলপথে বাণিজ্যের সুবিধা দিয়েছিল। আদিগঙ্গা বা দেগঙ্গা ইত্যাদি জায়গার উপস্থিতি এটাই প্রমাণ করে। টলেমির বর্ণনা ও পেরিপ্লাস গ্রন্থে উল্লেখিত ‘গাঙ্গে’ বন্দরকে অনেক খ্যাতনামা ঐতিহাসিক যেমন ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়, ব্রতীন্দ্রনাথ মুখার্জি প্রমুখ চন্দ্রকেতুগড়ের সাথে সমতুল্য করে দেখেছেন।

   এখানে উৎখননের ফলে কেবলমাত্র গড় এলাকার উত্তর অংশে খনা-মিহিরের ঢিবি ও গড়ের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ উন্মুক্ত হয়। এখানে উল্লেখিত খনা-মিহিরের ঢিবি অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। বরাহ ছিলেন বিক্রমাদিত্যের রাজসভার প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ। তার পুত্র হলো মিহির। এদের দুজনকে একসঙ্গে বলা হত বরাহমিহির। বরাহের পুত্রবধূ ছিল খনা। এই ‘খনা’ হল ‘খনার বচন’ এর খনা। খনা ছিল জ্যোতির্বিদ্যায় তুখোড় পারদর্শী, তার পান্ডিত্যের জন্যই শ্বশুর বরাহ রাজসভায় অপমানের ভয়ে গাঙ্গেয় উপত্যকায় সমুদ্রগুপ্তের করদ রাজা চন্দ্রকেতুর রাজ্যে চলে আসেন। খনা-মিহিরের যে ঢিবিটি খোদিত হয়েছে তা খনা-মিহিরের জ্যোতির্বিজ্ঞান মন্দির ছিল বলে অনেকে মনে করেন।

   গড় এলাকাটি ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের জন্য প্রাচীরবেষ্টিত ছিল। প্রবেশের জন্য ছিল সিংহদ্বার ও রাজ দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ পথ ছিল। প্রবেশ পথের পূর্ব দিকে পানীয় জলের জন্য ছিল বিশালাকার দিঘী যা বর্তমানে ‘চন্দ্রকেতুদহ’ নামে খ্যাত।

   গড়প্রাকারের বাইরে ছিল সেনানিবাস, কারখানা, বন্দর, হাতিশালা যা আজ ‘হাতিপাড়া’ নামে পরিচিত। সিংহদ্বারের প্রধান রাজপথের দুই পাশে ছিল নগরবাসীদের আবাসস্থল। ধর্ম উপাসনার জন্য গড়ের দুই ধারে দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় ছিল মঠ। নিকটস্থ সানপুকুর গ্রামে এর ধ্বংসাবশেষ লক্ষণীয়।

   বহি শত্রুর আক্রমণ বা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়াবার জন্য পোড়া ইটের গাথনিযুক্ত সুউচ্চ নগর প্রাকার ছিল। যা বর্তমানে ‘চন্দ্রকেতুঢিবি’ বা ‘চন্দ্রকেতুর গড়’ নামে পরিচিত। এখানকার প্রাসাদগুলো নির্মিত হত পোড়ামাটির ইট ও বিশেষ ধরনের সিমেন্ট জাতীয় পদার্থ দিয়ে। ছাদের জন্য কড়িকাঠ রূপে ব্যবহার করা হতো শক্ত ও মূল্যবান কাঠ। এছাড়াও বন্যা ভূমিকম্প ইত্যাদি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রাসাদ গুলি শক্ত মূল্যবান প্রোথিত কাঠের গুড়ি দ্বারা বেষ্টিত ছিল। গড়ের উত্তরে পদ্মা নদী ও পূর্ব-পশ্চিম বিদ্যাধরী নদীর শাখা ছিল। গড়ের পয়ঃপ্রণালীর মাধ্যমে এই শাখানদীপথে ময়লা ও জল নিকাশ হতো।

 বাণিজ্য :

   প্রাচীনকালের চন্দ্রকেতুগড় বাংলার বন্দর-নগর হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। বিদ্যাধরী নদীর ধারে গড়ে উঠেছিল এই বন্দর-নগর। গঙ্গার সাথে যোগসূত্রে পারস্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল হয়ে ফোয়েনিসিয়া থেকে পারস্য উপসাগরে, পশ্চিম ভারত, উত্তর সিন্ধু ও দক্ষিণ ভারতের আরিকামেডু অতিক্রম করে বাণিজ্যিক জাহাজ এসে পৌঁছাতো এই চন্দ্রকেতুকগড়ে। বর্তমান ইজরায়েল, লেবানন, তুরস্ক ছিল এই ফোয়েনিশিয়ার অন্তর্গত। এই বন্দর থেকে ছাপার জন্য রপ্তানি হতো নীল। এছাড়াও বাণিজ্য পণ্যের মধ্যে ছিল অ্যাম্বার নির্মিত পুঁতি, কাঁচ, পান্না, কর্ণেলিয়ান পাথর ইত্যাদি।

   বিভিন্ন সীলমোহর ও অভিলেখ থেকে ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী হরফের লেখা থেকে জানা যায় এখানে প্রচলিত মৈথিলী ও অর্ধ-মাগধী ভাষা সম্পর্কে। এছাড়া আরামিক লিপির অস্তিত্ব বৃহৎ আকারে বহির্দেশের সাথে যোগাযোগের সাক্ষ্য বহন করে। প্রাচীন গ্রিসের সঙ্গেও যে চন্দ্রকেতুগড়ের যোগ ছিল তার পুরাতাত্বিক প্রমাণ হলো এখানে প্রাপ্ত গ্রেকো-রোমান অ্যাম্ফরা। অ্যাম্ফরা হলো পানীয় রাখার পাত্র বিশেষ যা সহজে পচনশীল ও পানীয় দ্রব্য যেমন ভিনিগার, সসে ডোবা মাছ, ফল, মধু ইত্যাদি প্রক্রিয়াকরণের পর উচ্চ গ্রীবাযুক্ত দুইহাতলের অ্যাম্ফরায় স্থানান্তরিত করা হত। এখানে প্রাপ্ত অ্যাম্ফরাটি মৌর্য্য যুগের সমসাময়িক।

    এই অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন সময়ের রাজা-রাজড়াদের মুদ্রা পাওয়া গেছে যা রাজনৈতিক পালাবদলসহ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রমাণ দেয়। চন্দ্রকেতুগড়ের পশ্চিমে প্রবাহিত নদীপথে নৌকাযোগে গড় এলাকা থেকে ছ-মাইল দক্ষিণে মূল বিদ্যাধরী নদীতে বড় নৌকা বা জাহাজ ভিরত। এই জাহাজ মারফৎ বিদেশে পণ্য রপ্তানি হতো। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য পাঞ্চমার্ক মুদ্রাগুলিতে আমরা যে নৌকা বা জাহাজের প্রতিকৃতি দেখতে পায় তা ছিল একটিমাত্র ডকযুক্ত অর্থাৎ আকার আয়তনে সেগুলি ছিল ছোটো। এখানে প্রাপ্ত নিদর্শনগুলি থেকে মিশর, রোম, জাপান প্রভৃতি দেশের সাথে বাণিজ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়

এক সময়ে এই বন্দরেই ভিড়ত রোম ও গ্রিসের জাহাজ। আগে তারা নোঙর ফেলত আরিকামেডু ও তাম্রলিপ্তিতে। তাই চন্দ্রকেতুগড় সেকালের বড় বন্দর ও বাণিজ্য কেন্দ্র হলেও এটি ছিল সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের অন্যতম পীঠস্থান।

 মুদ্রা :

   এখান থেকে প্রাপ্ত মুদ্রাগুলি স্থানটির প্রাচীনত্বের স্তর নির্দেশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্রাপ্ত মুদ্রাগুলির বেশিরভাগই চতুর্থ-তৃতীয় শতকের পাঞ্চমার্ক মুদ্রা। এখানে প্রাপ্ত রুপোর পাঞ্চমার্কযুক্ত মুদ্রাগুলি ডিম্বাকার, চৌকো, গোলাকার আকৃতি বিশিষ্ট। মৌর্য্য পরবর্তী যুগের বিভিন্ন পাঞ্চমার্ক মুদ্রায় একদিকে নৌকার ছাপ আর অপরদিকে ডলফিন এর মত প্রাণীকে উৎকীর্ণ দেখা গেছে। যা স্পষ্টতই প্রমাণ করে এ সময়ে চন্দ্রকেতুগড়ের সাথে দেশ-বিদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের যোগসূত্রকে।

চন্দ্রকেতুগড় মুদ্রা

এছাড়াও শুঙ্গ-কুষান আমলের মুদ্রা ও স্বর্ণমুদ্রা এখানে প্রাপ্ত হয়েছে। গুপ্ত কালীন একটি স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে যেখানে চন্দ্রগুপ্ত ও লিচ্ছবি কুমারদেবীর বিবাহের দৃশ্য উৎকীর্ণ আছে। এখানে প্রাপ্ত গুপ্তকালীন মুদ্রার মধ্যে সমুদ্রগুপ্তের ধনুকধারী মুদ্রা উল্লেখযোগ্য। তবে এখানে মুদ্রা-ই বিনিময়ের একমাত্র  মাধ্যম ছিল না; প্রাপ্ত একটি সিলমোহর থেকে জানা যায় যে একদা দুর্ভিক্ষের সময় রাজা, প্রজাদের ঋণ হিসেবে শস্যের যোগান দেন এবং বলেন অবস্থার উন্নতি ঘটলে তার বদলে রাজাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ কড়ি দিয়ে এই ঋণ পরিশোধ  করতে হবে।

 

টেরাকোটার ভাস্কর্যে ধর্মীয়-সামাজিক জীবন :

   চন্দ্রকেতুগড়কে প্রাচীন বাংলার টেরাকোটা শিল্পের প্রধান পীঠস্থান বলা যেতে পারে। এখানে প্রাপ্ত পোড়ামাটির ভাস্কর্যগুলির সজীব চিত্র, লাস্যময়তা দর্শকদের হৃদয় কে প্রভাবিত করে। এই পোড়ামাটির ভাস্কর্যের বেশির ভাগই খ্রীঃ পূঃ ২০০ থেকে ৩০০ খ্রীঃ সময়কালের। টেরাকোটার ভাস্কর্যগুলি পোড়া ইটের মত লালচে অথবা লালচে বাদামী রঙের; কিছু কিছু আবার ধূসর বর্ণের। এখানকার উৎকীর্ণ মৃৎফলকেই সেকালের চিত্র-চরিত্র জীবন্ত রূপে ধরা দেয়। কখনো লাস্যময় নারীমূর্তি কখনো বহুল অলংকার ও ফুল দ্বারা সজ্জিত নারীমূর্তি, যক্ষ, যক্ষি ইত্যাদি শিল্পীর স্ব-আঙ্গিকে ফুটে উঠেছে। জীবজন্তুর মধ্যে হাতি, বাঘ, কুমির, মাছ, কচ্ছপ, মেষ ইত্যাদি দেখা গিয়েছে। প্রাপ্ত মৃৎফলক গুলিতে কখনো সামাজিক চিত্র হিসেবে ফসল কাটার চিত্র, তো কখনো সেকালে গৃহকোণের চিত্র হয়ে উঠেছে এর উপজীব্য বিষয়। এছাড়াও পঞ্চচূড় মূর্তি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। বিভিন্ন ধরনের মাতৃকা মূর্তির আধিক্য এখানকার টেরাকোটার শিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ভাস্কর্যে উৎকীর্ণ নারীর সাজস্বজ্জা চুলের বাধন খোঁপা ইত্যাদি মৌর্য্য যুগের শৈলীর। এছাড়াও একটি নারীমূর্তি হরপ্পায় প্রাপ্ত নারীমূর্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মৃৎফলক গুলিতে উৎকীর্ণ নারী মূর্তিগুলোতে তাদের সাজসজ্জাকে মুখ্য রূপে তুলে ধরা হয়েছে। এতে সেসময়ের নারীর সাজসজ্জা সম্পর্কে জানা যায়। গলার কণ্ঠহার, কানের দুল, হাতে পরিহিত অলংকার, প্রভূত সাজসজ্জা চন্দ্রকেতুগড়ের নগর জীবনের সমৃদ্ধির পরিচয় বহন করে।

চন্দ্রকেতুগড়

  

এ ভাস্কর্যগুলোতে যেমন দেব দেবী উত্তীর্ণ হয়েছে তেমনি উৎকীর্ণ হয়েছে মানব-মানবী, তাদের সম্পর্ক, দৈনন্দিন জীবন, সাজসজ্জা। সমাজের নানান খন্ডচিত্র এর মুখ্য বিষয় হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। এখানে পাওয়া গেছে একটি রোমান নারীর আবক্ষ মূর্তি। হাতির মতো বিভিন্ন জন্তু-জানোয়ার ইত্যাদি খেলনা মূর্তি পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত মূর্তিগুলো সঙ্গে গান্ধার শৈলীর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা য়ায়।  এখানে প্রাপ্ত মৃৎফলকে উৎকীর্ণ সূর্য দেবতার প্রতিকৃতি সূর্য উপাসনার ইঙ্গিত দেয় যা পারস্যের সাথে এখানকার সংযোগের পরিচয় বহন করে। এছাড়া সৌরচিহ্ন সমন্বিত একটি দেবী মূর্তি ও দেখা গেছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেবদেবীর তথা লক্ষ্মী, অপ্সারা, দেবী মায়া, বৌদ্ধ তারাদেবী ইত্যাদির মূর্তি এখানে পাওয়া গেছে। অশোকের সময় কাল থেকেই কুষাণ গুপ্ত পাল আমলের প্রায় সকল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে বাংলার শ্রমনদের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ থাকায় বাংলা ছিল বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান কেন্দ্রস্থল। তারপর হিন্দু ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনরুত্থানে ও বৌদ্ধধর্মের প্রভুধা বিভক্তির সাথে সাথে তা বাংলা থেকে লুপ্ত ও নির্বাসিত হয়। জৈনদের প্রাচীন মূর্তির নিদর্শনও এখানে পাওয়া গেছে।

   এখানে প্রাপ্ত মৃৎপাত্রগুলি সুন্দরভাবে ভাস্কর্যমন্ডিত। এগুলিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যথা- রোদে শুকানো মৃৎপাত্র ও আগুনে পোড়ানো মৃৎপাত্র। এখানে প্রাপ্ত একটি পোড়ামাটির পাত্রে রাশিচক্রের ছাপ পাওয়া গেছে যা থেকে এখানে সে সময়ের জ্যোতির্বিদ্যা চর্চা সম্পর্কেও জানা যায়।

   এখানে এক ধরনের মৃৎপাত্রের হদিস পাওয়া গেছে যা মূলত ঝুড়ির ছাপ যুক্ত। প্রাচীনকালে যখন কুমোরের চাকার ব্যবহার মানুষের রপ্ত হয়নি, সে সময় ঝুড়ির উপর কাদামাটি লেপে মৃতপাত্র প্রস্তুত করা হতো। চন্দ্রকেতুগড়ের এরূপ মৃৎপাত্রের অবশেষ তার প্রাচীনত্বকে আরো স্পষ্টভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরে। এর থেকে স্পষ্টই অনুমান করা যায় চন্দ্রকেতগড় ছিল বঙ্গভূমির প্রাচীন বন্দর-সভ্যতার শৈল্পিক-সাংস্কৃতিক কেন্দ্রস্থল।

   চন্দ্রকেতুগড়ের প্রাচীনতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর প্রমাণ সাপেক্ষ বিবরণী আমাদের কাছে এখনো ধোঁয়াশাপূর্ণ হয়ে আছে।  ১৯৫৭ সালে এখানে যে উৎখনন হয়েছিল তার স্পষ্ট রিপোর্ট আজও প্রকাশিত হয়নি। সেই প্রাক-মৌর্য্য যুগ থেকে শুরু করে কুষান-গুপ্ত-পাল যুগ পর্যন্ত চন্দ্রকেতুগড় তার অস্তিত্বে সমৃদ্ধির ছাপ রেখে গেছে। শুঙ্গ যুগ ছিল তার স্বর্ণযুগ। নদী খাতের পশ্চাৎ অপসারণের ফলে পাল পরবর্তী সময় থেকে ধীরে ধীরে উন্নত এই বন্দরনগর তার গুরুত্ব হারাতে থাকে। তারপর মধ্যযুগের কোন এক সময়ে গিয়ে এই সমৃদ্ধ শহর সম্পূর্ণরূপ পরিত্যক্ত হয়। প্রাচীন গঙ্গারিডি তথা বঙ্গভূমির প্রাণকেন্দ্র সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যশালী বন্দর-নগর চন্দ্রকেতুগড়  বিস্মৃতির অন্তরালে ধীরে ধীরে মুছে যায় বাঙালির হৃদয় থেকে।

   ভবিষ্যতে বাংলার এই প্রাচীন নগরে নিয়ে গবেষণা ও উৎখনন হলে হয়তো আরো অনেক তথ্য পাওয়া যাবে যা বাঙালির প্রাচীন গৌরবময় ইতিহাসকে সুস্পষ্ট করে তুলবে ও তার পরিধিকে আরো বর্ধিত করতে সাহায্য করবে।


১। রজনিকান্ত গুহ, মেগাস্থিনিসের ভারত বিবরন, ১৯৯৩, নবযুগ সঙ্গস্করন, পৃ-৩৭।

২। রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, ১৩৭৩ বঙ্গাব্দ, চতুর্থ সংস্করণ, পৃ-১৮

৩। প্রভাত কুমার ঘোষ, গঙ্গারিডি ও বঙ্গভুমি, ১৯৮৮, পৃ-১০-১১।

তথ্যসুত্র

* এম এ জব্বার, বালান্দা-চন্দ্রকেতু ইতিকথা, ১৩৯০ বঙ্গাব্দ।

* SANDHI project, IIT Kharagpur, Chandraketugarh- rediscovering a missing link in Indian history.

* প্রভাতকুমার ঘোষ, গঙ্গারিডি ও বঙ্গভুমি, ১৯৮৮।

* রজনিকান্ত গুহ, মেগাস্থিনিসের ভারত বিবরন, ১৯৯৩, নবযুগ সঙ্গস্করন।

* Upinder Singh, A History of Ancient and Early Medieval India, 2009, 23rd impression.

* রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, ১৩৭৩ বঙ্গাব্দ, চতুর্থ সংস্করণ।

* রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাঙ্গালার ইতিহাস, ২০০৮, সপ্তম সঙ্গস্করন(২০১৯)।

আরও পড়ুন ->> ষোড়শ মহাজনপদ

* Topic Covered :

চন্দ্রকেতুগড়, চন্দ্রকেতুগড় কোথায় অবস্থিত, চন্দ্রকেতুগড় pdf, চন্দ্রকেতুগড় কেন বিখ্যাত, চন্দ্রকেতু গড়, চন্দ্রকেতুগড় কোন নদীর তীরে, চন্দ্রকেতুগড় কোন নদীর তীরে অবস্থিত, চন্দ্রকেতুগড় কোন জেলায় অবস্থিত , চন্দ্রকেতুগড়ের ইতিহাস ।

Leave a Comment